Hi

০৬:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে স্মরণীয় রমজান

জনগণের খবর নিউজ ডেস্ক

 

পবিত্র রমজান মাস শুধু রোজা, তারাবিহ এবং কুরআন তেলাওয়াতের মাস নয়; এটি ইতিহাসের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষীও। এই মাসে ঘটে যাওয়া অসাধারণ ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, ইসলাম কখনো বাস্তবতা বা পার্থিব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্মবিশ্বাস নয়; ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এটি জীবিকা বা দায়িত্ব থেকে মানুষকে বিমুখ করে না। নবীজির যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রমজান মাসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা এই সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। নিচে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো:-
আসমান থেকে ওহি অবতরণ
নবুয়তের প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬১০ খ্রিস্টাব্দ) নবীজির ওপর ওহি বা ঐশীবাণী নাজিল হওয়া শুরু হয়। এই মাহেন্দ্রক্ষণে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগৎকে সম্মানিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন; তাই তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর ঐশী নূরের মিলনস্থল, খোদায়ি হিকমতের আধার এবং তাঁর বাণীর অবতরণস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে অবিনশ্বর আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়। ফলে এই ঘটনাটি মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত এবং মানবতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল
নবুয়তের দশম বছরের রমজান মাসে নবীজির প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রথম মুসলিম নারী এবং নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। শিআবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধের সময় তাঁর সমর্থন ও ধৈর্য ছিল অপরিসীম। তাঁর ইন্তেকালের একই বছরে আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন, যা নবীজির জন্য ‘আমুল হুজন’ (দুঃখের বছর) নামে পরিচিত।
আজান প্রবর্তন
হিজরি প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬২৩ খ্রিস্টাব্দ) নামাজের জন্য আজানের বিধান প্রবর্তিত হয় এবং এর প্রচলন শুরু হয়। সেই সময়ে মুমিনদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক সময় জানা কঠিন ছিল, তাই তারা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন। সেই রাতে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যিনি তাঁকে আজানের শব্দাবলি ও পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। সকালে তিনি নবীজির কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালেন। নবীজি বললেন: ‘ইনশাআল্লাহ, এটি একটি সত্য স্বপ্ন। তুমি বেলালের সঙ্গে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, যেন সে আজান দেয়; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে বেশি উচ্চ ও সুমধুর’ (তিরমিজি : ১৮৯)। সেই মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে নামাজের জন্য আজান ধ্বনিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ
হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজির নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং আবু জাহেলের নেতৃত্বে মক্কার মুশরিকদের মধ্যে এই যুদ্ধ হয়। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা কুরাইশদের হাজারেরও বেশি সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন। আবু জাহেলসহ কুরাইশদের অধিকাংশ নেতার নিধন হয় এই যুদ্ধে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, যখন তোমরা ছিলে অত্যন্ত দুর্বল’ (সুরা আলে ইমরান : ১২৩)। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেন, যা কুরাইশদের মনে তাদের প্রতি সমীহ ও ভীতি তৈরি করে। এই যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত গনিমত বা সম্পদ মুসলমানদের সচ্ছলতা আনে এবং ইসলামি পতাকাকে সমুন্নত করে সত্যের বাণীকে আজ পর্যন্ত দেদীপ্যমান রাখতে সহায়তা করে।
মক্কা বিজয়
হিজরি অষ্টম সালের রমজান মাসে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) ইতিহাস এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়। কুরাইশরা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র শর্ত ভঙ্গ করায় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। নবীজি মক্কা বিজয়ের জন্য দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এই বাহিনী মক্কায় পৌঁছালে কোনো রক্তপাত বা যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শহরটি জয় করে। এই মহান বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং মক্কার কুরাইশদের আধিপত্যের অবসান ঘটে। নবীজি ও তাঁর বাহিনীর ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে মক্কাবাসীরা মুগ্ধ হন এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব ও তাঁর স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন।
কাদেসিয়া যুদ্ধ
হিজরি ১৫ সালের রমজান মাসে (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধে পারস্যের রাজধানী মাদাইনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ইরাক অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে। এটি রমজানে মুসলিমদের অসাধারণ সাহস ও ঈমানের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর ইন্তেকাল
হিজরি ২১ সালের ১৮ রমজান ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক সেনাপতি হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইরাক ও সিরিয়া বিজয়ে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইয়ারমুক যুদ্ধসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অসীম সাহসিকতার সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েও তিনি কখনো পরাজিত হননি। রণক্ষেত্রের পরিবর্তে সিরিয়ার হিমস শহরে নিজ বিছানায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
হজরত আলি (রা.)-এর শাহাদাত
হিজরি ৪০ সালের ২১শে রমজান (৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ইবনে আবী তালিব রা. কুফায় ফজরের নামাজের সময় খারিজি ইবনে মুলজামের বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি নবীজির চাচাতো ভাই ও জামাতা ছিলেন।
আন্দালুস (স্পেন) বিজয়
হিজরি ৯২ সালের রমজান মাসে (৭১১ খ্রিস্টাব্দ) মুসলমানরা আন্দালুস জয় করে। এরপর সেখানে প্রায় আটশ বছর মুসলিমরা শাসন করে। এই অভিযানের সূচনা হয় যখন মুসা বিন নুসায়ের আন্দালুস বিজয়ের লক্ষ্যে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। তারা একটি প্রণালি পার হয়ে সেখানে পৌঁছান, যা পরবর্তীতে তারিক বিন জিয়াদের নামানুসারে ‘জিব্রাল্টার প্রণালি’ (জাবাল আল-তারিক) নামে পরিচিতি পায়। উপকূলে পৌঁছানোর পর তারিক বিন জিয়াদ নিজের বাহিনীর সব জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে কারও মনে পিছু হটার চিন্তা না আসে। এরপর তিনি এক তেজোদীপ্ত ভাষণ দেন, যা সৈন্যদের মনোবল তুঙ্গে নিয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা দক্ষিণ আন্দালুসে গথ বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং পর্যায়ক্রমে সেভিল ও টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জয় করে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরো ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
সিন্ধু বিজয়
হিজরি ৯৩ সালের ৬ রমজান মুহাম্মদ বিন কাসিম আল-সাকাফির নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং হিন্দু রাজা দাহিরের বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক ‘রাওয়ারের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় রাজকীয় হাতিগুলো অংশ নিয়েছিল এবং টানা পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ চলে। অবশেষে রাজা দাহির নিহত হলে সিন্ধু বিজয় সম্পন্ন হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানদের জন্য বিশাল এশিয়া মহাদেশের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
সিসিলি বিজয়
হিজরি ২১২ সালের রমজান মাসে (৮২৭-৮২৮ খ্রিস্টাব্দ) আসাদ ইবনে ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ভূমধ্যসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ সিসিলি জয় করে। এই বিজয় মুসলিমদের ইউরোপের দিকে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল এবং সেখানে ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিত্তিনের যুদ্ধ
হিজরি ৫৮৩ সালের ২৬ রমজান (১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ) দখলদার ক্রুসেডার বাহিনী এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনের নাসেরা ও তাবারিয়া শহরের মধ্যবর্তী ‘হিত্তিন’ গ্রাম ছিল এই চিরস্মরণীয় যুদ্ধের রণক্ষেত্র। এই যুদ্ধে মুসলমানরা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। এর ফলে দখলদারদের পতন ঘটে, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) পুনরুদ্ধার হয় এবং পূর্বে ক্রুসেডারদের দখলে থাকা অধিকাংশ ভূখণ্ড মুক্ত করা সম্ভব হয়। এই বিজয়ের খবর ইউরোপীয়দের মনে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় তারা বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে এবং ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধের নামে জেরুজালেমের মুসলমানদের ওপর পুনরায় নৃশংস আক্রমণ শুরু করে।
ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে শেয়ার করুন

মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ই-মেইল সহ সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি সংরক্ষণ করা হবে।

আপডেট : ০৩:৫৩:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
৪৩ দেখা
© সর্বস্বত স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © Jonogoner Khobor - জনগণের খবর
                                  কারিগরি সহযোগিতায়ঃ মো. সাইফুল ইসলাম                                  

ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে স্মরণীয় রমজান

আপডেট : ০৩:৫৩:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

 

পবিত্র রমজান মাস শুধু রোজা, তারাবিহ এবং কুরআন তেলাওয়াতের মাস নয়; এটি ইতিহাসের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষীও। এই মাসে ঘটে যাওয়া অসাধারণ ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, ইসলাম কখনো বাস্তবতা বা পার্থিব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্মবিশ্বাস নয়; ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এটি জীবিকা বা দায়িত্ব থেকে মানুষকে বিমুখ করে না। নবীজির যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রমজান মাসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা এই সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। নিচে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো:-
আসমান থেকে ওহি অবতরণ
নবুয়তের প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬১০ খ্রিস্টাব্দ) নবীজির ওপর ওহি বা ঐশীবাণী নাজিল হওয়া শুরু হয়। এই মাহেন্দ্রক্ষণে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগৎকে সম্মানিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন; তাই তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর ঐশী নূরের মিলনস্থল, খোদায়ি হিকমতের আধার এবং তাঁর বাণীর অবতরণস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে অবিনশ্বর আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়। ফলে এই ঘটনাটি মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত এবং মানবতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল
নবুয়তের দশম বছরের রমজান মাসে নবীজির প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রথম মুসলিম নারী এবং নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। শিআবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধের সময় তাঁর সমর্থন ও ধৈর্য ছিল অপরিসীম। তাঁর ইন্তেকালের একই বছরে আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন, যা নবীজির জন্য ‘আমুল হুজন’ (দুঃখের বছর) নামে পরিচিত।
আজান প্রবর্তন
হিজরি প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬২৩ খ্রিস্টাব্দ) নামাজের জন্য আজানের বিধান প্রবর্তিত হয় এবং এর প্রচলন শুরু হয়। সেই সময়ে মুমিনদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক সময় জানা কঠিন ছিল, তাই তারা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন। সেই রাতে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যিনি তাঁকে আজানের শব্দাবলি ও পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। সকালে তিনি নবীজির কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালেন। নবীজি বললেন: ‘ইনশাআল্লাহ, এটি একটি সত্য স্বপ্ন। তুমি বেলালের সঙ্গে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, যেন সে আজান দেয়; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে বেশি উচ্চ ও সুমধুর’ (তিরমিজি : ১৮৯)। সেই মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে নামাজের জন্য আজান ধ্বনিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ
হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজির নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং আবু জাহেলের নেতৃত্বে মক্কার মুশরিকদের মধ্যে এই যুদ্ধ হয়। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা কুরাইশদের হাজারেরও বেশি সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন। আবু জাহেলসহ কুরাইশদের অধিকাংশ নেতার নিধন হয় এই যুদ্ধে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, যখন তোমরা ছিলে অত্যন্ত দুর্বল’ (সুরা আলে ইমরান : ১২৩)। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেন, যা কুরাইশদের মনে তাদের প্রতি সমীহ ও ভীতি তৈরি করে। এই যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত গনিমত বা সম্পদ মুসলমানদের সচ্ছলতা আনে এবং ইসলামি পতাকাকে সমুন্নত করে সত্যের বাণীকে আজ পর্যন্ত দেদীপ্যমান রাখতে সহায়তা করে।
মক্কা বিজয়
হিজরি অষ্টম সালের রমজান মাসে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) ইতিহাস এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়। কুরাইশরা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র শর্ত ভঙ্গ করায় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। নবীজি মক্কা বিজয়ের জন্য দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এই বাহিনী মক্কায় পৌঁছালে কোনো রক্তপাত বা যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শহরটি জয় করে। এই মহান বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং মক্কার কুরাইশদের আধিপত্যের অবসান ঘটে। নবীজি ও তাঁর বাহিনীর ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে মক্কাবাসীরা মুগ্ধ হন এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব ও তাঁর স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন।
কাদেসিয়া যুদ্ধ
হিজরি ১৫ সালের রমজান মাসে (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধে পারস্যের রাজধানী মাদাইনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ইরাক অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে। এটি রমজানে মুসলিমদের অসাধারণ সাহস ও ঈমানের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর ইন্তেকাল
হিজরি ২১ সালের ১৮ রমজান ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক সেনাপতি হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইরাক ও সিরিয়া বিজয়ে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইয়ারমুক যুদ্ধসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অসীম সাহসিকতার সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েও তিনি কখনো পরাজিত হননি। রণক্ষেত্রের পরিবর্তে সিরিয়ার হিমস শহরে নিজ বিছানায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
হজরত আলি (রা.)-এর শাহাদাত
হিজরি ৪০ সালের ২১শে রমজান (৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ইবনে আবী তালিব রা. কুফায় ফজরের নামাজের সময় খারিজি ইবনে মুলজামের বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি নবীজির চাচাতো ভাই ও জামাতা ছিলেন।
আন্দালুস (স্পেন) বিজয়
হিজরি ৯২ সালের রমজান মাসে (৭১১ খ্রিস্টাব্দ) মুসলমানরা আন্দালুস জয় করে। এরপর সেখানে প্রায় আটশ বছর মুসলিমরা শাসন করে। এই অভিযানের সূচনা হয় যখন মুসা বিন নুসায়ের আন্দালুস বিজয়ের লক্ষ্যে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। তারা একটি প্রণালি পার হয়ে সেখানে পৌঁছান, যা পরবর্তীতে তারিক বিন জিয়াদের নামানুসারে ‘জিব্রাল্টার প্রণালি’ (জাবাল আল-তারিক) নামে পরিচিতি পায়। উপকূলে পৌঁছানোর পর তারিক বিন জিয়াদ নিজের বাহিনীর সব জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে কারও মনে পিছু হটার চিন্তা না আসে। এরপর তিনি এক তেজোদীপ্ত ভাষণ দেন, যা সৈন্যদের মনোবল তুঙ্গে নিয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা দক্ষিণ আন্দালুসে গথ বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং পর্যায়ক্রমে সেভিল ও টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জয় করে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরো ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
সিন্ধু বিজয়
হিজরি ৯৩ সালের ৬ রমজান মুহাম্মদ বিন কাসিম আল-সাকাফির নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং হিন্দু রাজা দাহিরের বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক ‘রাওয়ারের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় রাজকীয় হাতিগুলো অংশ নিয়েছিল এবং টানা পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ চলে। অবশেষে রাজা দাহির নিহত হলে সিন্ধু বিজয় সম্পন্ন হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানদের জন্য বিশাল এশিয়া মহাদেশের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
সিসিলি বিজয়
হিজরি ২১২ সালের রমজান মাসে (৮২৭-৮২৮ খ্রিস্টাব্দ) আসাদ ইবনে ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ভূমধ্যসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ সিসিলি জয় করে। এই বিজয় মুসলিমদের ইউরোপের দিকে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল এবং সেখানে ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিত্তিনের যুদ্ধ
হিজরি ৫৮৩ সালের ২৬ রমজান (১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ) দখলদার ক্রুসেডার বাহিনী এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনের নাসেরা ও তাবারিয়া শহরের মধ্যবর্তী ‘হিত্তিন’ গ্রাম ছিল এই চিরস্মরণীয় যুদ্ধের রণক্ষেত্র। এই যুদ্ধে মুসলমানরা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। এর ফলে দখলদারদের পতন ঘটে, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) পুনরুদ্ধার হয় এবং পূর্বে ক্রুসেডারদের দখলে থাকা অধিকাংশ ভূখণ্ড মুক্ত করা সম্ভব হয়। এই বিজয়ের খবর ইউরোপীয়দের মনে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় তারা বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে এবং ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধের নামে জেরুজালেমের মুসলমানদের ওপর পুনরায় নৃশংস আক্রমণ শুরু করে।