
আবারও এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার রাতে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও রাজপথ দ্বন্দ্বের নতুন মাত্রা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রার লাগাতার অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ জীবনের ক্রমবর্ধমান অসহনীয়তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১২ দিনে ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু রয়েছে। আহত ও গ্রেফতার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
এদিকে, বিক্ষোভকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানে ‘শক্তিশালী হামলা’ চালানো হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প। বিপরীতে খামেনি বলেছেন, ট্রাম্পকেই ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হবে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নারী-জীবন ও স্বাধীনতার আন্দোলন ইরানকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত গণআন্দোলন। যদিও এবারের বিক্ষোভের সূচনা নৈতিক পুলিশ বা সামাজিক স্বাধীনতা নয়, বরং অর্থনীতি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের বৈধতা, শাসনব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই মৌলিক প্রশ্ন তুলছে।
রাষ্ট্রের পরিচিত অস্ত্র ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট : দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় পুরো দেশেই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস প্রথম এই তথ্য নিশ্চিত করে। দিনের শুরুতেই পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে আংশিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্ল্যাকআউটের কারণ জানায়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সরকার প্রায় নিয়মিতভাবেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং ২০২২ সালের গণআন্দোলনের সময়ও একই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ভিডিও ও ছবি বাইরে পাঠানো ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ সীমিত রাখা।
বিবিসি পার্সিয়ান জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় শুধু আন্দোলনের খবর নয়, আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, পরিবারগুলোর যোগাযোগ এবং সাধারণ নাগরিক সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে আহত বিক্ষোভকারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে ব্ল্যাকআউটের কারণে।
মৃত্যু নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি ও বাস্তব চিত্র : দ্য গার্ডিয়ান বলছে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইরানে বরাবরের মতোই বিভ্রান্তিকর তথ্যযুদ্ধ চলছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু। সংস্থাটি বলছে, বুধবার ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। সেই এক দিনেই ১৩ জন নিহত হন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান স্বাধীনভাবে ২২ জনের মৃত্যুর পরিচয় ও তথ্য যাচাই করেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখানো হচ্ছে। তাদের হিসাবে, নিরাপত্তা বাহিনীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ২১।
ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি, তেহরানের প্রতিক্রিয়া : শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবদিক থেকে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ‘খুব কঠোর’ হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নতুন ওই মন্তব্য তারই ধারাবাহিকতা।
কনজারভেটিভ রেডিও হোস্ট হাগ হেউইটকে বৃহস্পতিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি তাদের (ইরান সরকার) জানিয়ে দিয়েছি যদি তারা মানুষকে হত্যা করা শুরু করে, যেটি তারা দাঙ্গার সময় করে থাকে, যদি (এবার) তারা এমনটি করে তা হলে আমরা তাদের ওপর খুব শক্তভাবে আঘাত হানব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব কাছ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা জানে এবং তাদের খুব শক্তভাবে বলা হয়েছে, এখন আমি আরও শক্তভাবে বলছি। যদি তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা শুরু করে তা হলে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইরানের মানুষের জন্য কী বার্তা দেবেন এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার ব্যাপারে অনুভূতি খুবই দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন।’
ট্রাম্পের সবশেষ হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরান তার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রেখেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলার হুমকি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, তারা পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা রাখবে না এবং আগে হামলার শিকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরান আরও জানিয়েছে, যেকোনো হামলা বা অব্যাহত শত্রুতামূলক আচরণের বিপরীতে তারা চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেবে।