,
মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন

আড়াই যুগ পত্রিকা ফেরি করে বেড়ান শাহআলম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০২৩
  • ৬৭ Time View

গোলাম সারোয়ার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ কোনো ক্লান্তি আর বিশ্রাম নেই। জীবিকার প্রয়োজনে দৈনিক সাইকেলে করে ছুটে চলেছেন শহরের অলিগলি, হাট-বাজার আর গ্রামগঞ্জে। সঙ্গে রয়েছে জাতীয় পত্রিকা, চাকরির খবর আর বিভিন্ন ম্যাগাজিন।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরামহীনভাবে প্রতিদিন অন্তত: ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিটি রাস্তার ধুলোবালি গায়ে মেখে পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন মো. শাহআলম (৪৮) নামে এক পত্রিকা বিক্রেতা।

এভাবেই দীর্ঘ আড়াই যুগ ধরে গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিতে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আখাউড়া থেকে বিজয়নগরের হরেষপুর পর্যন্ত ছুটে চলেছেন তিনি। তবে বৈরী আবহাওয়া কিংবা রোগ-শোক একদিনের জন্য তাকে দমাতে পারেনি। শাহআলম জেলার বিজয়নগর উপজেলার মিরাশানী এলাকার মৃত নিদান আলীর ছেলে। ছোটবেলা থেকেই এই পেশায় নিয়োজিত থেকে পত্রিকা বিক্রির আয় দিয়ে পরিবার পরিজনের ভরণপোষণ করছেন। এতেই চলছে তার জীবিকা।

হকার শাহআলম জানান, মূলত ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে সকালে আখাউড়ায় বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা আসে। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে ১ দিন আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পত্রিকা আনতে হয়। পত্রিকা বিক্রির জন্য প্রতিদিন সকাল ৮টায় তাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে সাইকেল চালিয়ে আখাউড়ায় আসেন।

এরপর ট্রেনে আসা পত্রিকাগুলো সাইকেলের সামনে-পেছনে বেঁধে আবার বিরামহীনভাবে ছুটে চলতে হয় আখাউড়া পৌর শহর, খড়মপুর, দুর্গাপুর, আজমপুর, সিঙ্গারবিল, মিরাশানি, আওলিয়া বাজার, চম্পকনগরসহ বিভিন্ন জায়গায়। এক এক করে নিয়মিত গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি। দুপুরের খাবার বা নাস্তা তাকে রাস্তায় করতে হয়। পত্রিকা বিক্রি করতে গিয়ে কখনো কখনো সন্ধ্যা হয়ে যায়।

তিনি বলেন, এর মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে মাসিক পত্রিকার গ্রাহক। তারা মাস শেষে টাকা পরিশোধ করছেন। তাছাড়া চলার পথে হাটবাজারে নগদ টাকায় ও পত্রিকা বিক্রি করছেন।

শাহআলম বলেন, আজ থেকে ৩০ বছর আগে মাত্র ২০টি জাতীয় পত্রিকা দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে তিনি প্রায় আড়াইশ জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ম্যাগাজিন বিক্রি করছেন। প্রতিমাসে পত্রিকা বিক্রি থেকে ১২-১৩ হাজার টাকা আয় হয়। করোনার আগে স্থানীয় পর্যায়ে পত্রিকার চাহিদা ভালো ছিল। প্রতিদিন ৪ শতাধিকের উপর জাতীয় পত্রিকা বিক্রি করা হতো। সেটা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাই আয়ও কমে এসেছে। তাছাড়া প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে খবর পাওয়ায় পত্রিকা ক্রয় করে লোকজন তেমন পড়তে চান না। শুধু অফিস, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, কিছু বাসা-বাড়িতে নিয়মিত পত্রিকা রাখছেন। কিন্তু আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা খোঁজে এমন মানুষদের খুঁজে বেড়াচ্ছি।

তিনি জানান, পরিবারে স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে । এই ক্ষুদ্র ব্যবসা করে সংসার চালালেও ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার প্রতি তার রয়েছে যথেষ্ট আগ্রহ। বর্তমানে তার এক ছেলে কলেজে, এক ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী, বাকি ছেলে-মেয়েরা মাদরাসায় পড়ছেন। দিন রাত কঠিন পরিশ্রম করলেও সন্তানদের কিছুই তিনি বুঝতে দেননি। এখন সমাজের অসহায় হতদরিদ্র মানুষের কাছে তিনি একজন আদর্শ মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দীর্ঘ বছর ধরে খবরের এই ফেরিওয়ালা দায়িত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এই চ্যালেঞ্জিং পেশাকে।

শাহআলম বলেন, বিভিন্ন দিবসে পত্রিকা বন্ধ ছাড়া তার কোনো অবসর নেই। পত্রিকা বিক্রির সুবাদে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণ করতে পারি না। প্রতিদিন সাইকেলে চড়ে পত্রিকা বিক্রি করা কষ্টকর হয়ে যায়। ট্রেনযোগে পত্রিকা আসায় এ জন্য খুব সকালে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। অন্য পেশায় যাওয়ার বড় ধরনের কোনো পুঁজি না থাকায় এই পেশায় থাকতে হচ্ছে।

পত্রিকার পাঠক মো. আল-আমিন বলেন, পত্রিকার দাম যখন ৩ টাকা ছিল তখন থেকেই আমি শাহআলমের কাছ থেকে পত্রিকা রাখি। এখন পত্রিকার দাম বেড়েছে। কিন্তু পত্রিকা রাখা বন্ধ হয়নি। সকালে পত্রিকা না পড়লে খুবই খারাপ লাগে।

গ্রাহক সিরাজ মিয়া জানান, শাহআলম দীর্ঘ ১০ বছর ধরে একটানা তাকে পত্রিকা দিয়ে আসছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ। মাস শেষে একটি বিল দেন সে অনুযায়ী তাকে টাকা দেওয়া হয়।

আখাউড়া প্রেস ক্লাব সভাপতি দুলাল ঘোষ বলেন, শাহআলম ব্যতিক্রম ও একজন দায়িত্বশীল মানুষ। তার কল্যাণে সাধারণ মানুষ পত্রিকা পড়ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিয়ে আসছেন। সাইকেলে করে মাইলের পর মাইল চড়ে পত্রিকা বিক্রি করা আসলেই কষ্টকর। তাছাড়া এই অনলাইনের যুগে পত্রিকার চাহিদা কিছুটা কমলেও এখনো বেশ কিছু গ্রাহককে তিনি ধরে রাখতে পেরেছেন। আসলে পত্রিকা পত্রিকাই, হাতে ধরে পত্রিকা পড়ার মজাই অন্য রকম।

তিনি পত্রিকা ব্যবসায়ী না ভেবে নিজেকে সংবাদপত্রের সেবক মনে করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরও খবর পড়ুন:

Jonogoner Khobor - জনগণের খবর পোর্টালের গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ:

 আমাদের পরিবার

About Us

Contact Us

Disclaimer

Privacy Policy

Terms and Conditions

Design & Developed by: Sheikh IT
sheikhit

জনগণের খবর পোর্টালের কোনো প্রকার নিউজ, ছবি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে না। ধন্যবাদ।